তুমি মানুষ না, তুমি ফেরেশতা – বলা কি ঠিক? মানুষ শ্রেষ্ঠ নাকি ফেরেশতা? কোরআন হাদিসের সহি ব্যাখ্যা

প্রায় সময়ই শোনা যায় একজন অন্যজনকে উদ্দেশ্য করে মহৎ ভাবাপন্ন দেখাতে গিয়ে বলে থাকে “তুমি মানুষ না, তুমি ফেরেশতা” আসলে উক্ত কথাটি বলা ভুল হবে। কেনো ভুল তা ব্যাখ্যা করছি :

প্রথমত, মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, যাকে সয়ং ফেরেশতারা সিজদা করেছিলো আল্লাহর নির্দেশে। যদি আল্লাহ মানুষকে ফেরেশতাদের থেকে নিম্ম মানের ভাবতেন তবে মানুষকে বলতেন ফেরেশতাদের সিজদা করতে।

মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, ” যখন  আমি ফেরেশতাদেরকে  বলেছিলাম,  আদমের  প্রতি  সিজদা  করোতখন  তারা  সিজদা করেছিল,  তবে  ইবলিস  ছাড়া।…” [সূরা বাকারাহ :৩৪]

তবে এখানে বলে রাখা ভালো ইবলিশ গঠনমূলক ভাবে জ্বীন ছিলো। একসময় ফেরেশতার মত সম্মানের স্থান পেলেও মানুষকে সিজদা না করার ফলে এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালার নির্দেশ না মানার কারনে তাকে শয়তান ইবলিশ বা অভিশপ্ত করা হয়। তবে এখানে সুস্পষ্ট যে, ফেরেশতাগণ মানব সৃষ্টিকে সিজদা করেছেন। ফেরেশতাদের মানবকে সম্মান করতে বলা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, এটা যদি কোনো মানুষকে অন্য কোনো মানুষ বলে যে, তুমি মানুষ না তুমি ফেরেশতা। তবে মানুষ নামক সৃষ্টিকে ছোট করে দেখা হয়ে যাবে। কেনোনা মানুষকে তৈরি করা হয়েছে শ্রেষ্ঠত্ব সম্মান দানের মধ্য দিয়ে।

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘অবশ্যই আমি আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি এবং তাদের পানিতে ও স্থলে প্রতিষ্ঠিত করেছি, তাদের উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদের অনেক সৃষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।’ (সুরা ইসরা : ৭০)

পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব সাব্যস্ত হয়েছে। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যখন আল্লাহ পৃথিবী সৃষ্টি করেন, তখন তা দুলতে থাকে। অতঃপর তিনি পর্বতমালা সৃষ্টি করে তার ওপর তা স্থাপন করেন। ফলে পৃথিবী স্থির হয়ে যায়। ফেরেশতারা পর্বতমালা দেখে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করেন, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার সৃষ্টির মধ্যে পর্বত থেকে মজবুত কি কিছু আছে? আল্লাহ বলেন, হ্যাঁ, তা হলো লোহা। ফেরেশতারা আবার প্রশ্ন করল, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার সৃষ্টির মধ্যে লোহা থেকে মজবুত কি কিছু আছে? আল্লাহ বলেন, হ্যাঁ আছে, তা হলো আগুন। ফেরশতারা আবার প্রশ্ন করে, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার সৃষ্টির মধ্যে আগুনের চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী কি কোনো কিছু আছে? আল্লাহ বলেন, হ্যাঁ আছে, তা হলো বাতাস। ফেরেশতা প্রশ্ন করে, হে আমাদের রব! আপনার সৃষ্টির মধ্যে বাতাসের চেয়ে অধিক প্রবল কি কিছু আছে? আল্লাহ বলেন, ‘হ্যাঁ আছে, তা হলো আদম সন্তান। সে ডান হাতে যা দান করে, বাঁ হাত থেকে তা গোপন রাখে।’ (মুসনাদ আহমদ, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৭৬)

এখানে স্পষ্ট ভাবে বোঝা যাচ্ছে – পর্বত, লোহ, আগুন, বাতাস থেকে মানুষ হচ্ছে মহান আল্লাহ এর সেরা সৃষ্টি।

মর্যাদার দিক থেকে মানুষ ও ফেরেশতাদের মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে মহানবী (সা.) বলেন, বিচার দিবসে আল্লাহর কাছে মানুষ অপেক্ষা অন্য কোনো সৃষ্টি অধিক সম্মানের হবে না। জিজ্ঞেস করা হয়, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর নিকটবর্তী ফেরেশতাদের ক্ষেত্রেও কি এটা প্রযোজ্য হবে? অর্থাৎ নিকটবর্তী ফেরেশতাদের চেয়েও কি মানুষের মর্যাদা বেশি? মহানবী (সা.) প্রত্যুত্তরে বলেন, ‘নিকটবর্তী ফেরেশতারাও এক শ্রেণির মানুষের চেয়ে অধিক মর্যাদাবান হবে না।’ (বায়হাকি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭৪)

যেখানে এতো এতো সম্মান মানুষকে দেয়া হয়েছে, সেখানে আমরা কিভাবে ও কেনো কোনো ব্যক্তি মহৎ কাজ করলে আমরা বলি “তুমি মানুষ না, তুমি ফেরেশতা” ??

বিঃ দ্রঃ তবে আমার ধারণার ও বিশ্লেষণ ভুল হতে পারে। এক্ষেত্রে এর চেয়ে সহি ও ভরসা যোগ্য দলিলের ব্যাখ্যা কারো জানা থাকলে জানাবেন।

Leave a Comment